Powered by Froala Editor
অধৈর্যশীলতাই শহরগুলোতে অসহনীয় যানজটের প্রধান কারণ
Powered by Froala Editor
ধরুণ আপনি এখন বিজয় স্মরণির জ্যামে বসে আছেন, আপনার লক্ষ্য রাস্তা ধরে এগিয়ে বামে মোড় নিয়ে তেজগাঁও রোডে ঢুকে যাওয়া। কিন্তু কিছুদুর এগিয়ে দেখতে পেলেন বামে মোড় নেয়ার স্থানে কয়েকটি গাড়ি সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছে। যার জন্য আপনি যেতে পারছেন না এবং আপনার মত অপেক্ষারত শত শত গাড়ি, যারা অন্য রোডে যাবে তারা সিগন্যালের জন্য দাঁড়িয়ে রইলো।
উপরোক্ত ঘটনায় হয়ত মনে হতে পারে এটি রাস্তার নিয়ম না মানার ফল কিন্তু আমার মতে এটি কতিপয় মানুষের অধৈর্যশীলতার উদাহরণ। ঢাকা শহর কিংবা অন্য ব্যস্ততম শহরগুলোতে রাস্তায় প্রায়শই এমন চিত্র দেখা যায়। মাঝ রাস্তায় বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠানো নিত্যদিনের একটি উদাহরণ। কারো হয়ত অত্যন্ত ব্যস্ততা আছে কিংবা কেউ অফিস যেতে দেরি করে ফেলেছেন, তিনি দ্রুত বাস স্টপে না গিয়ে সহজেই রাস্তার সাইডে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে বাসকে থামিয়ে সেটায় উঠে যেতে পারবেন। এর ফলে পিছনে থাকা গাড়িগুলোকে গতি কমিয়ে দিতে হয় অথবা থেমে যেতে হয় এবং এর ফলে কী হয় তা সবারই জানা।
বর্তমান সময়ে আরেকটি জনপ্রিয় যানবাহন হচ্ছে মোটরসাইকেল। প্রবল যানজটের এই যুগে রাস্তার যেকোন পাশ দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারে এই দ্বিচক্রযান। ২০২১ সালে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিগত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ মোটর সাইকেল বিক্রি বেশি হয়েছে। শুধু যাতায়াত নয়, পেশাগত কারণেও বাড়ছে এর সংখ্যা। কিন্তু রাস্তায় বর্তমানে যানজট সৃষ্টির অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করে মোটরসাইকেল। বড় রাস্তায় সিগন্যাল পড়লে দেখা যায়, সাইড দিয়ে মোটর সাইকেলগুলো সারিবদ্ধভাবে চলে যাচ্ছে। কিন্তু সামনে গিয়ে তারা আর যেতে পারেনা ফলে সেখানেই রাস্তা বন্ধ হয়ে একটা জটলা তৈরি হয়ে যায়। এর ফলে অন্য রাস্তা অভিমুখী যানবাহন যেতে না পারায় তৈরি হয় যানজট। মোটরসাইকেল চালকের অধৈর্য্যশীলতা এবং অস্থিতিশীলতার জন্য অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয় জনসাধারণের। ঠিক এমনটা ঘটে রিকশাগুলোর ক্ষেত্রেও। এক রিকশা আরেক রিকশার সাথে প্রতিযোগিতা, বারবার লেন পরিবর্তন, নিয়ম না মেনে চালানো কিংবা যত্রতত্র পার্কিং করা, এসকল অস্থিতিশীল কর্মকান্ডের জন্য তৈরি হয় চরম বিশৃঙ্খলা।
যেসকল এলাকায় বা শহরে জনগণের সংখ্যা বেশি, মূলত সেসকল জায়গাগুলোতে যানজটের প্রবণতা দেখা যায়। এতক্ষণ আমরা দেখেছি, রাস্তায় থাকা যানবাহন কীভাবে যানজট সৃষ্টি করতে পারে অস্থিতিশীলতার জন্য। তবে রাস্তায় যারা পথচারী আছেন তাদের অধৈর্য্যশীলতার পরিচয় হরহামেশা পাওয়া যায়। হয়ত কোন ব্যস্ততম রাস্তায় পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার সুবিধার্থে ফুটওভারব্রীজ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে অন্য চিত্র দেখা যায়। ব্যস্ততা হোক কিংবা অন্য কারণ, পথচারীকে বেশিরভাগ সময় ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাস্তার ডিভাইডার ক্রস করে হাত উঁচু করে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হতে দেখা যায়। ঠিক তখনই উচ্চগতিতে চলা গাড়িকে ধীরগতিতে রূপান্তর করে কিংবা থামিয়ে পথচারী পার হওয়ার জন্য জায়গা করে দিতে হয়। যার অধৈর্যশীলতার ফলশ্রুতিতে স্বল্প পরিসর থেকে ভয়াবহ যানজট তৈরি হয়ে যায়।
উন্নত দেশ লন্ডন একটি জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও যানজট নিরসনে তারা সফল। সেই দেশের নাগরিকদের মধ্যে আছে সচেতনতা, আছে অধৈর্য্যশীলতার পরিচয় দিয়ে যানজট সৃষ্টি না করার মানসিকতা। লন্ডনের মত উন্নত দেশগুলোর যানজট নিরসনে সফলতার পেছনের কারণ জানতে গেলে বোঝা যাবে যে যানজট সৃষ্টিতে অধৈর্য্যশীলতা ও অস্থিতিশীলতা কত বড় ভূমিকা পালন করে। মূলত এই কারণ থেকে উঠে আসে রাস্তায় নিয়ম লঙ্ঘন করা, যথেচ্ছা আচরণ করা, ট্রাফিক আইন না মানা সহ বেশিরভাগ কারণ।
বাংলাদেশে সবচেয়ে জনবহুল শহর তার রাজধানী ঢাকা। পরিসংখ্যান বলে, ঢাকা শহরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১১ ভাগ বসবাস করে। অর্থাৎ ধারণ ক্ষমতার অনেক বেশি মানুষ এই অতিমহানগরীতে। যানজট তৈরি হওয়ার শুরুর কারণ এটি। যখন কোন শহরে ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ থাকে, সে তুলনায় রাস্তার স্বল্পতা থাকে তখন একটু অসাবধানতায় রাস্তায় তৈরি হয়ে যায় বড়সড় যানজট। অপরদিকে আরেক গবেষণা বলছে, বিগত বছরের তুলনায় রাস্তায় ৬৭% ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে যা রাস্তার ৪০ শতাংশ জায়গা দখল করে থাকে। একই রাস্তায়, দুইটি প্রাইভেট গাড়ির জায়গায় যখন একটি বাসে ৬০ জন যেতে পারে সেখানে ব্যক্তিগত গাড়িতে যেতে পারছে সর্বোচ্চ ৭-৮ জন মানুষ। জনবহুল এই শহরে এর ফলে তৈরি হচ্ছে অকল্পনীয় যানজট।
ওপরে লন্ডন শহরের উদাহরণ দেয়া আছে। সেই শহরেই পথচারী হাঁটার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ও পরিসরে ফুটপাত। আছে গাড়ি পার্কিং করার নির্দিষ্ট জায়গা এবং বাস থামার জন্য নির্দিষ্ট বাসস্টপেজ। যখন বাংলাদেশের চিত্র কল্পনা করা হয় তখন লক্ষ্য করা যায়, এখানে ফুটপাতে বসে রয়েছে অসংখ্য ভাসমান দোকান, নেই হাঁটার পর্যাপ্ত জায়গা। রাস্তার পাশেই দেখা যায় অনেকাংশ জায়গা জুড়ে পার্ক করা রয়েছে গাড়ি। এসকল কর্মকাণ্ড রোধ করার জন্য নিয়ম আছে, আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ করার উদাহরণ সচরাচর কম দেখা যায়।
শহরাঞ্চলের অসহনীয় যানজট বর্তমানে মানুষ তার জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তারা হয়ত টেরই পাচ্ছেন না জীবন থেকে কত মূল্যবান সময় অপচয় হয়ে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৩২লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যার মধ্যে আমার আপনার সবার মূল্যবান সময় রয়েছে। কিন্তু যতদিন মানুষ ও ওপরমহল উদাসীনতা, অধৈর্য্যশীলতা, অস্থিতিশীলতা, থেকে বের হয়ে এসে যানজট নিরসনে নিজের অবস্থান হতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ না হচ্ছে ততদিন হয়ত এই দুর্ভোগ জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত অভিশাপ হিসেবে রয়ে যাবে।
Powered by Froala Editor